কলিমদ্দি দফাদার- আবুজাফর শামসুদ্দীন

‘কলিমদ্দি দফাদার’ গল্পটি সংকলিত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গল্প-সংকলন ‘মুক্তিযুদ্ধের গল্প’ থেকে।
 
চরিত্র-
কলিমদ্দি দফাদার- এলাকার দফাদার। বিশ বাইশ বছর বয়সে ইউনিয়ন বোর্ডের দফাদারিতে ঢুকেছিল। তখন হতে সে কলিমদ্দি দফাদার নামে পরিচিত। এখন বয়স প্রায় ষাট, চুল দাড়িতে পাক ধরেছে। বয়সকালে সে লাঠি খেলত। এখন সে লাঠি খেলে না, কিন্তু ঐতিহ্যরূপে বাবরি চুল রাখে। চৌকিদারের সর্দার দফাদার। গ্রামাঞ্চলের একটি মর্যাদাবান পদ। মর্যাদা সে পায়ও। লোকেরা তাকে দফাদার সাব ডাকে। কিন্তু পদমর্যাদার ভার তার বাড় বাড়ায়নি। তার আচার-আচরণ সহজ, সরল। হালকা সরসিতায় রসপটু। যৌবনে রাত জেগে পুঁথি পড়ত।
হরিমতি ও সুমতি- গরীব বিধবা হরিমতি ও তার মেয়ে সুমতি। খোঁজখবর নিয়ে পুকুর ঘাটে গিয়েও ওরা বাঁচতে পারে না। পাঁচজন যমদূত (পাকসেনা) ওদের ধাওয়া করে স্কুল ঘরে আটকে ধর্ষণ করে।
সাইজদ্দি খলিফা- কলিমদ্দি দফাদারের বাল্যকালের পাতানো দোস্ত। ওর একমাত্র ষোল বছরের ছেলেকে পাকসেনারা কলিমদ্দির সামনেই গুলি করে মারে।
 
কলিমদ্দির বাড়ি- একটি ছনের ঘর এবং তালপাতার ছাউনি দেয়া একটি একচালা পাকঘর, সামনে এক ফালি উঠোন। তার সামনে পাঁচকাঠা পরিমাণ জায়গা। সেটিতে সে ‘আগুইনা’ চিতার চাষ করে।… চাষের জমি সামান্য। মাস-দু’মাসের খোরাকি হয়।… স্ত্রী ও পুত্রকন্যা নিয়ে পাঁচজনের সংসার, বেতন সামান্য। কয়েকটি আম, কাঁঠাল, পেয়ারা ও পেঁপে গাছ অতিরিক্ত আয়ের উৎস। আর আছে একটি ছোট গাভী এবং স্ত্রীর একটি ছাগল ও মোরগ হাঁস দু’চারটি। বিয়োলে গাভীটি সের দু’সের দুধ দেয়।
 
প্রেক্ষাপট- ১৯৭১ সাল। ভাদ্রের শেষ। ; মুক্তিযুদ্ধ
 
পটভূমি- ঢাকা জেলার একটি বাৎসরিক প্লাবন অঞ্চল। শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে। বর্ষায় কোনো কোনো গ্রাম রীতিমত দ্বীপ হয়ে যায়। ঢুকতে নাও-কোন্দা লাগে।
 
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও উদ্ধৃতি
যুদ্ধের প্রথমদিকেই খান সেনারা থানা সদর দখল করে নিয়েছিল। থানার কাছাকাছি ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলওয়ে। কিছুদূর যেতে নদীর ওপর পুল।
একদল খান সেনা বাজারসংলগ্ন হাই স্কুলটিকে ছাউনি করে নিয়েছে।
বুধবার।… সকাল দশটায় কলিমদ্দি দফাদারের ডিউটি পড়ে। আজ ইউনিয়ন বোর্ডের কাঁচা সড়ক পথে পশ্চিম দিকে মুক্তিবিরোধী অভিযান। আট-দশজন সশস্ত্র খান সেনা।… লক্ষ্যস্থান …. গ্রাম। আগুন দেয়ার মালমসলা, অস্ত্রও সঙ্গে আছে।
বেলা এগারোটা। মাঠের ওপর দিয়ে অপ্রশস্ত মেটে সড়ক। মাঠ পেরিয়ে একটি ছোট গ্রাম। তারপরেই লক্ষ্যস্থল।
পরের গ্রামে সেদিনের মূল যুদ্ধক্ষেত্র। সে গ্রামের পশ্চিমে অথৈ জলের বিস্তীর্ণ মাঠ। পানির ওপর বাওয়া ধানের সবুজ শীষ। গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে যাওয়ার জন্য ধান-ক্ষেতের ওপর দিয়ে নাওদাঁড়া।
বেলা তখন বারোটা হঠাৎ কমান্ডার নির্দেশ দেয়, হল্ট! এক দো!
সামনে কাঠের পুল। দু’দিক থেকে তিরিশ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে খাড়া হয়ে কিছু দূরে ওঠার পর মাঝখানে সমতল, নিচে প্লাবিত খাল এবং দু’দিকের বাওয়া ধানের খেত, উদ্ধত ধানের শীষ পানির সঙ্গে তাল রেখে চেড়ে চলছে।
স্থানীয় লোকদের কাছে উঁচু টিলাগুলো টেক নামে পরিচিত।
চৌচালা টিনের ঘরের টুয়া সুস্পষ্ট।
 
কখনও কখনও খতরনাক অবস্থার মধ্যে পড়তে হয়।
অল্প দিন আগেই একটা খতরনাক ঘটনা ঘটেছে।
হরিমতি সুমতিকে ওরা হত্যা করে না। রক্তাক্ত অজ্ঞান অবস্থায় ফেলে খান সেনারা রাইফেল কাঁধে স্কুল ঘর ত্যাগ করে।
সে (কলিমদ্দি) সরকারি লোক, নিয়মিত নামাজ পড়ে এবং যা হুকুম হয় তা পালন করে।
সে আড়-কাঠি, আগে আগে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাওয়া তার ডিউটি।– কলিমদ্দি সম্পর্কে
‘আমি ভাই সরকারি লোক, যখনকার সরকার তখনকার হুকুম পালন করি।’- কলিমদ্দি
কলিমদ্দি দফাদারের বাল্যকালের পাতানো দোস্ত সাইজদ্দি খলিফার ষোল বছরের ছেলে একবার মাত্র মা বলে।
‘হাঁ, হাঁ, এক ফিস্ট হু জায়েগা।’
‘মালুম হোতা পুলসেরাত।’- কমান্ডার, পুল সম্পর্কে
ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা পুলের ওপর থেকে লাফিয়ে পড়ে খালের জলে ঝাঁপুড়ি খেলে।
আসলে পুলটা তেমন একটা নড়বড়ে নয়, মানুষ গরু ওপরে উঠলে কিছু কাঁপে- কাঁপালে আরো বেশি কাঁপে- কাঁপুনি একটা সংক্রামক ব্যাধি কিনা তাই।
কলিমদ্দি দফাদার যত এগিয়ে যায়, তার পদযুগল নিপুণ অভিনেতার পদযুগলের মতো ঠকঠক কাঁপে, পুল কাঁপে দ্বিগুণ তালে।
কলিমদ্দিকে আবার দেখা যায় ষোলই ডিসেম্বর সন্ধ্যায় বাজারের চা স্টলে।
সে-ই শুধু তার পুরনো সরকারি পোশাকে সকলের পরিচিত কলিমদ্দি দফাদার।
 
শব্দার্থ ও টীকা
নাও- নৌকা
কোন্দা- তালগাছ দিয়ে তৈরি নৌকা
দফাদার- চৌকিদারের সর্দার
‘আগুইনা’ চিতা- ভেষজ উদ্ভিদ
খতরনাক- বিপজ্জনক
গন্ধবণিক- গন্ধদ্রব্য-ব্যবসায়ী
বাড়ুই- ঘরের চাল ছাওয়া মিস্ত্রী
ভাঙ্গুনতি- নদীর পাড়ের ভাঙনশীল অংশ
নাওদাঁড়া- নৌকা চলার ছোট খালের মত পথ
টুয়া- ঘরের চালের শীর্ষ
ধরনি- ধরার অবলম্বন
 
লেখক পরিচিতি
জন্ম : ১৯১৯, ঢাকা জেলার কালিগঞ্জ
মৃত্যু : ১৯৮৮
একাধারে গল্পকার, ঔপন্যাসিক, নাট্যরচয়িতা, অনুবাদক ও সাংবাদিক
গ্রন্থ-
উপন্যাস- ভাওয়াল গড়ের উপাখ্যান, পদ্মা মেঘনা যমুনা, সংকর সংকীর্তন, প্রপঞ্চ, দেয়াল
গল্পগ্রন্থ- আবুজাফর শামসুদ্দীনের শ্রেষ্ঠ গল্প, শেষ রাত্রির তারা, এক জোড়া প্যান্ট ও অন্যান্য, রাজেন ঠাকুরের তীর্থযাত্রা
অন্যান্য- আত্মস্মৃতি

In : BCS

Related Articles

এই সপ্তাহের সেরা পোস্ট করেছেন –

Anika Najnin

University of Peoples

Chemical Engg.

Mr Sojol Ahmed

State University Bangladesh

Computer Science